রজঃস্বলা মীমাংসা
মোক্ষ মীমাংসা
(কীভাবে মনুষ্যের মুক্তি সম্ভব)
আপনারা হয়তো অনেকের কাছে শুনে থাকবেন যে, “আমরা কলিহত জীব, অতশত কোটি কোটি মন্ত্রের বেদ-পাঠ আমরা করতে পারবো না, কৃষ্ণ নাম করলেই আমরা মুক্তি পাব”। এমনকি অনেকে এরূপও বলে যে, “একবার কৃষ্ণ নামে যত পাপ হরে, জীবের কি সাধ্য আছে তত পাপ করে”। আর এসব লোককথা শুনেই আমরা হয়ে যাই আনন্দে আত্মহারা, সারাদিন যা ইচ্ছে করি রাতে এসে কৃষ্ণ নাম জপ করি। ব্যাস্, এতেই সব শেষ, আমাদের শিক্ষা শেষ, আমাদের অধ্যবসায় শেষ, আমাদের চর্চা শেষ, আমাদের জ্ঞান অন্বেষণ শেষ, তার সাথে আমাদের মোক্ষ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাও শেষ। কেন বলছি এ-কথা? কারণ যে জাতি নিজস্ব জ্ঞান তথা ঐশ্বরিক উপদেশকে উপেক্ষা করে তাঁদের সর্বনাশ হবে না তো, কী হবে?
আজ সমাজে যারা শাক্ত, তাদের মোক্ষের পথ ভিন্ন; যারা বৈষ্ণব, তাদের মোক্ষের পথ ভিন্ন; মোদ্দা কথা একেক মত-পথের একেক রকম মুক্তি পথ। এই সব মতে-পথে চলে কি আদৌ তারা মুক্তি পাবে? না! অনেকেই আবার বলে যে যা করে করুক, সকলেই মুক্তি পাবে নিজ নিজ মত-পথ অনুযায়ী। কিন্তু আসলেই কি তাই? না। কারণ, যেরূপ সূর্য কেবল এক দিকেই ওঠে, অন্য তিন দিকে ওঠে না; সেইরূপ মোক্ষ অর্থাৎ মুক্তিও কেবল একটি মার্গেই পাওয়া যায়, সব মার্গে নয়। মহাভারতে একবার ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির পিতামহ ভীষ্মকে জিজ্ঞেস করেছিল যে —
“মোক্ষঃ পিতামহেনোক্ত উপায়ান্নুপুপায়তঃ।
তমুপায়ং য়থান্যায়ং শ্রোতুমিচ্ছামি ভারত॥”
(মহাভারত শান্তিপর্ব, অধ্যায় ২৭৪, শ্লোক ১)
অনুবাদ – যুধিষ্ঠির পিতামহ ভীষ্মকে জিজ্ঞেস করলো যে, হে পিতামহ! আপনি সঠিক উপায়ে মোক্ষ প্রাপ্তির মার্গ বলুন, ভ্রান্ত উপায়ে নয়। হে ভরতনন্দন! সেই সঠিক মার্গ কোনটি? আমি তা শুনতে চাই।
এর উত্তরে পিতামহ ভীষ্ম বলেন —
“পূর্বে সমুদ্রে য়ঃ পন্থাঃ স ন গচ্ছতি পশ্চিমম্।
একঃ পন্থা হি মোক্ষস্য তন্মে বিস্তরতঃ শৃণু॥”
(মহাভারত শান্তিপর্ব, অধ্যায় ২৭৪, শ্লোক ৪)
অনুবাদ – দেখো বলছি, যে মার্গ পূর্ব সমুদ্রের দিকে যায়, তা পশ্চিম সমুদ্রের দিকে যেতে পারে না। এই প্রকার মোক্ষেরও একটিই মার্গ রয়েছে।
☞ যেখানে পিতামহ ভীষ্ম পর্যন্ত বলছেন যে “মোক্ষ লাভের কেবল একটি মাত্রই পথ রয়েছে” সেখানে আমাদের আজকের প্রচলিত এই মত-পথ সমূহ সাধারণতই ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়ে যায়।
আমার এরূপ বলার কারণ কী? কারণ, আমি চাই সমগ্র সংসার যেন এই মিথ্যার জাল থেকে বেরিয়ে সত্যকে গ্রহণ করতে পারে। যেরূপ বিদুর বলেছিল —
“পুরুষা বহবো রাজন্ সততং প্রিয়বাদিনঃ।
অপ্রিয়স্য তু পথ্যস্য বক্তা শ্রোতা ব দুর্লুভাঃ॥”
(বিদুর নীতি ৩৭.১৪)
সরলার্থ – হে ধৃতরাষ্ট্র! সর্বদা সুন্দর-সুষ্ঠ বচনকারী সংসারে অনেক ব্যক্তি তুমি পাবে, কিন্তু কটু এবং হিতকারী বচনকারী এবং শ্রবণকারী অনেক বিরলতার সহিত পাবে।
সেইরূপ, সংসারে অনেক ব্যক্তিই অনেক কথা বলবে, সেগুলো ভালোও লাগবে, কিন্তু শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃত নিয়মের কথন অনেকের ভালো না লাগলেও সেই কথাই প্রকৃত সত্য ও পালনীয়।
আজ আমরা বেদাদি শাস্ত্র থেকে মুক্তি লাভের উপায় সম্পর্কে জ্ঞাত হবো, চলুন শুরু করা যাক।
আমরা সকলেই জানি যে পরমাত্মা কেবল একজন৷ “ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ” [ঋগ্বেদ ১০.১২১.১] অর্থাৎ, এই উৎপন্ন জগতের সেই পরমেশ্বরই একমাত্র স্বামী। তো সেই পরমেশ্বরকে প্রাপ্ত করার বিষয়ে বেদ বলছে —
“ত্বং চ সোম নো বশো জীবাতুং ন মরামহে।
প্রিয়স্তোত্রো বনস্পতিঃ॥”
(ঋগ্বেদ ১/৯১/৬)
পদার্থ – হে (সোম) সৎকর্মে প্রেরক প্রভু ! আপনি (নঃ) আমাদের (জীবাতুম্) জীবনের (বশঃ) কামনাকারী (প্রিয়স্তোত্রঃ) এবং যাঁর গুণের কথন প্রেম উৎপন্ন কারক এভাবে (বনস্পতিঃ) আপনি আপনার ভক্ত ও সেবনীয় পদার্থের পালনকারী। আপনাকে জেনে (ন মরামহে) আমার মৃত্যুকে প্রাপ্ত হই না তথাপি মোক্ষরূপী অমর অবস্থাকে প্রাপ্ত হই।
সরলার্থ – হে সৎকর্মে প্রেরক প্রভু ! আপনি আমাদের জীবনের কামনাকারী এবং যাঁর গুণের কথন প্রেম উৎপন্ন কারক এভাবে, সেই আপনি আপনার ভক্ত ও সেবনীয় পদার্থের পালনকারী। আপনাকে জেনে আমার মৃত্যুকে প্রাপ্ত হই না তথাপি মোক্ষরূপী অমর অবস্থাকে প্রাপ্ত হই।
এছাড়াও (ঋগ্বেদ ১/১৬৪/২৩)-এ বলা রয়েছে “য় ইত্তদ্বিদুস্তেঽমৃতত্বমানশুঃ” অর্থাৎ যে সেই ব্রহ্মকে জানে, সে অমৃতত্ব মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/১/২)-তে বলা হয়েছে “ব্রহ্মবিদাপ্নেতি পরম্” অর্থাৎ ব্রহ্মবেত্তাই পরমফল মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।
“বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
ত্বমেব বিদিত্বাতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেঽয়নায়॥”
(যজুর্বেদ ৩১/১৮)
পদার্থ – মনুষ্যের কাছে আপ্তকাম ঋষির ঐশ্বরিক আহ্বান, শোন, হে মানব! (অহম্) আমি (এতম্) পূর্বে উক্ত (মহান্তম্) অত্যন্ত গূঢ়, (আদিত্যবর্ণম্) আদিত্যের তুল্য প্রকাশস্বরূপ (তমসঃ) অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে (পরস্তাৎ) পৃথক বর্তমান (পুরুষম্) সেই পরমাত্মাকে (বেদ) জেনেছি। (ত্বম্ এব) তাঁকে (বিদিত্বা) জেনেই তোমরা (মৃত্যুম্) মৃত্যুর চক্রকে (অতি এতি) অতিক্রম করতে পারবে, (অন্য) অন্য কোন (পন্থাঃ) পথ/মার্গ (অয়নায়) অভীষ্ট মোক্ষের জন্য (ন বিদ্যতে) বিদ্যমান নেই।
সরলার্থ – মনুষ্যের কাছে আপ্তকাম ঋষির ঐশ্বরিক আহ্বান, হে মানব! আমি অত্যন্ত গূঢ়, আদিত্যের তুল্য প্রকাশস্বরূপ, অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে পৃথকরূপে বর্তমান সেই পরমাত্মাকে জেনেছি। তাঁকে জেনেই তোমরা মৃত্যুর চক্রকে অতিক্রম করতে পারবে, অভীষ্ট মোক্ষের জন্য অন্য কোন পথ বা মার্গ আর নেই।
ভাবার্থ – পরমাত্মা উপদেশ দিচ্ছেন যে, তাঁকে জানতে হবে। সেই গূঢ় আদিত্যের ন্যায় পরমাত্মা অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের আড়ালে বর্তমান। অন্ধকারকে ভেদ করে তাঁকে জেনেই এই অবিরাম জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষপ্রাপ্তি সম্ভব। এছাড়া মুক্তির অন্য কোন পথ নেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিখ্যাত বেদমন্ত্রটির অনুবাদ করেছিলেন এভাবে —
‘‘শোনো বিশ্বজন, শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ!
দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে
মোহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে।
জ্যোতির্ময় তারে জেনে তারি পথ চাহি
মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো অন্য পথ নাহি।
রে মৃত ভারত শুধু এক পথ আছে নাহি অন্যপথ।”
এই মন্ত্র দ্বারা স্বয়ং পরমাত্মাই আমাদের জানান দিচ্ছে যে, মোক্ষকে প্রাপ্ত করতে গেলে আগে জানতে হবে তাঁকে। তাঁকে না জেনে কেউই মোক্ষ লাভ করতে পারবে না। এবার তাহলে আসি কীভাবে আমরা পরমাত্মাকে জানবো এই বিষয়ে। পরমাত্মাকে জানা মানে তাঁর আকার, আকৃতি, দেহের রং এগুলো জানা নয়, বরং তাঁর স্বরূপকে জানা। পরমাত্মার স্বরূপ কেমন, এই বিষয়ে বেদ বলছে —
“স পর্য়গাচ্ছুক্রমকায়মব্রণমস্নাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্ ।
কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূর্য়াথাতথ্যতোঽর্থান্ ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ॥”
(যজুর্বেদ ৪০/৮)
পদার্থ – হে মনুষ্য! যে ব্রহ্ম (শুক্রম্) শীঘ্রকারী, তেজস্বী, সর্বশক্তিমান, (অকায়ম্) স্থূল, সূক্ষ্ম এবং কারণ শরীর রহিত, (অব্রণম্) ছিদ্ররহিত এবং যাকে খণ্ডিত করা যায় না, (অস্নাবিরম্) নাড়ি আদির বন্ধন রহিত, (শুদ্ধম্) অবিদ্যাদি দোষ রহিত হওয়ার কারণে সদা পবিত্র, (অপাপবিদ্ধম্) যিনি কখনো পাপযুক্ত, পাপাচারী এবং পাপপ্রেমী নন, তিনি (পরি অগাৎ) সর্বত্র ব্যাপক, (কবিঃ) সর্বজ্ঞ, (মনীষী) সকল জীবের মনোবৃত্তির জ্ঞাতা, (পরিভূঃ) দুষ্ট পাপীদের তিরস্কারকারী, (স্বয়ম্ভূঃ) অনাদিস্বরূপ, যার সংযোগ দ্বারা উৎপত্তি এবং বিয়োগ দ্বারা বিনাশ হয় না, যার মাতা পিতা কেউ নেই এবং যার গর্ভবাস, জন্ম, বৃদ্ধি এবং ক্ষয় হয় না, সেই পরমাত্মা (শাশ্বতীভ্যঃ) সনাতন, অনাদিস্বরূপ, নিজ স্বরূপের দৃষ্টিতে উৎপত্তি এবং বিনাশ রহিত (সমাভ্যঃ) প্রজাদের জন্য (য়াথাতথ্যতঃ) যথাযথভাবে (অর্থান্) বেদের দ্বারা সমস্ত পদার্থের (ব্যদধাৎ) বিশেষ উপদেশ প্রদান করেছেন, (সঃ) সেই পরমাত্মাই তোমাদের উপাস্য ।
অনুবাদ – হে মনুষ্য! যে ব্রহ্ম শীঘ্রকারী, তেজস্বী, সর্বশক্তিমান, স্থূল, সূক্ষ্ম এবং কারণ শরীর রহিত, ছিদ্ররহিত এবং যাকে খণ্ডিত করা যায় না, নাড়ি আদির বন্ধন রহিত, অবিদ্যাদি দোষ রহিত হওয়ার কারণে সদা পবিত্র, যিনি কখনো পাপযুক্ত, পাপাচারী এবং পাপপ্রেমী নন, তিনি সর্বত্র ব্যাপক, সর্বজ্ঞ, সকল জীবের মনোবৃত্তির জ্ঞাতা, দুষ্ট পাপীদের তিরস্কারকারী, অনাদিস্বরূপ, যার সংযোগ দ্বারা উৎপত্তি এবং বিয়োগ দ্বারা বিনাশ হয় না, যার মাতা পিতা কেউ নেই এবং যার গর্ভবাস, জন্ম, বৃদ্ধি এবং ক্ষয় হয় না, সেই পরমাত্মা সনাতন, অনাদিস্বরূপ, নিজ স্বরূপের দৃষ্টিতে উৎপত্তি এবং বিনাশ রহিত প্রজাদের জন্য যথাযথভাবে বেদের দ্বারা সমস্ত পদার্থের বিশেষ উপদেশ প্রদান করেছেন, সেই পরমাত্মাই তোমাদের উপাস্য ।
পরমেশ্বর কেমন? যে ব্রহ্ম শীঘ্রকারী, সর্বশক্তিমান, স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ শরীররহিত, ছিদ্ররহিত এবং অখণ্ড নাড়ি আদির বন্ধনরহিত, অবিদ্যাদি দোষরহিত হওয়ার কারণে সদা পবিত্র; যিনি কখনো পাপযুক্ত, পাপাচারী এবং পাপপ্রিয় হন না; তিনি সর্বজ্ঞ, সকল জীবের মনেবৃত্তির জ্ঞাতা, দুষ্ট পাপীদের তিরস্কারকারী, স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ অনাদি, তিনি সংযোগ দ্বারা উৎপত্তি এবং বিয়োগ দ্বারা বিনাশ হন না। তাঁর মাতা পিতা কেউ নেই, তিনি কখনো গর্ভবাস করেন না। তিনি জন্ম, বৃদ্ধি এবং ক্ষয়রহিত। অনন্ত শক্তিবান, অজ, নিরন্তর সদা মুক্ত, ন্যায়কারী, নির্মল, সর্বজ্ঞ, সবার সাক্ষী, নিয়ন্তা, অনাদিস্বরূপ ব্রহ্ম, সৃষ্টির আদিতে সনাতন অনাদি স্বরূপ দ্বারা উৎপত্তি এবং বিনাশ দ্বারা রহিত জীবের জন্য যথার্থরূপে বেদের দ্বারা সমস্ত পদার্থের উপদেশ করেছেন।
এই হচ্ছে পরমাত্মার প্রকৃত স্বরূপ। তাঁকে এইরূপে না জানলে কেউই মুক্তি লাভ বা মোক্ষকে প্রাপ্ত করতে পারবে না।
মনুস্মৃতিতে বলা রয়েছে যে, ছয় প্রকারের কর্ম আছে। যা মোক্ষ প্রাপ্ত করায়। তো চলুন দেখে নেই কোন সেই ছয় কর্ম —
“বেদাভ্যাসস্তপোজ্ঞানমিন্দ্রিয়াণাং চ সংযমঃ।
ধর্মক্রিয়াঽত্মচিন্তা চ নিঃশ্রেয়সকরং পরম্॥”
(মনুস্মৃতি ১২/৮৩)
পদার্থ – (বেদাভ্যাসঃ, তপঃ, জ্ঞানম্, ইন্দ্রিয়াণাং সংযমঃ, ধর্মক্রিয়া, চ আত্ম-চিন্তা) বেদের অভ্যাস, তপ অর্থাৎ ব্রতসাধনা, জ্ঞান, ইন্দ্রিয় সংযম, ধর্মক্রিয়া এবং আত্মচিন্তা অর্থাৎ পরমাত্মার জ্ঞান এবং ধ্যান; এই ছয়টি (নিঃশ্রেয়সকরং পরম্) মোক্ষ প্রদানকারী সর্বোত্তম কর্ম।
সরলার্থ – বেদের অভ্যাস, তপ অর্থাৎ ব্রতসাধনা, জ্ঞান, ইন্দ্রিয় সংযম, ধর্মক্রিয়া এবং আত্মচিন্তা অর্থাৎ পরমাত্মার জ্ঞান এবং ধ্যান; এই ছয়টি মোক্ষ প্রদানকারী সর্বোত্তম কর্ম।
(i) বেদের অভ্যাস: বেদ সনাতন ধর্মের মূল —
বেদোঽখিলো ধর্মমূলং স্মৃতিশীলে চ তদ্বিদাম্ ।
আচারশ্চৈব সাধূনামাত্মনস্তুষ্টিরেব চ॥ (মনুস্মৃতি ২.৬)। তাই বেদ ব্যতিত কখনো ধর্ম তথা ঈশ্বরকে জানা যায় না। অতএব মোক্ষ প্রাপ্ত করার ক্ষেত্রে মুখ্য স্তম্ভ হচ্ছে পবিত্র বেদ।
(ii) তপস্যা বা ব্রতসাধনা: মনুস্মৃতি ১২.১০৪ তে বলা হয়েছে “তপো বিপ্রস্য নিঃশ্রেয়সকরং পরম্” অর্থাৎ তপস্যা বা ব্রতসাধনা হলো বেদজ্ঞের জন্য মুক্তির পরম সাধন।
(iii) জ্ঞান বা সত্যবিদ্যা: সাংখ্যদর্শনের অধ্যায় ৩, সূত্র ২৩-তে রয়েছে “জ্ঞানান্মুক্তিঃ” অর্থাৎ জ্ঞানের দ্বারাই মুক্তি বা মোক্ষ লাভ হয়।
(iv) ইন্দ্রিয় সংযম: “শমে যত্নবান্ স্যাৎ” (মনুস্মৃতি ১২.৯২) অর্থাৎ ইন্দ্রিয় সংযমী ব্যক্তি মোক্ষ প্রাপ্তির যোগ্য হয়ে থাকে।
(v) ধর্মক্রিয়া: ধর্মক্রিয়া হলো ধর্মে অন্তর্গত সকল পবিত্র কার্য, যেমনঃ যজ্ঞ আদি। এই বিষয়ে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন — “যজ্ঞদানতপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যমেব তৎ” (গীতা ১৮/৫) অর্থাৎ যজ্ঞ, দান, তপস্যারূপ কর্ম কখনো কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করা উচিত নয়। এর মধ্যেই আত্মচিন্তা নিহিত রয়েছে।
(vi) ধ্যান (উপাসনা): পবিত্র বেদে বলা রয়েছে —
“নাম নাম্না জোহবীতি পুরা সূর্য়াৎপুরোষসঃ।
য়দজঃ প্রথমং সংবভূব স হ তৎস্বরাজ্যমিয়ায় য়স্নান্নন্যৎপরমস্তি ভূতম্॥”
(অথর্ববেদ ১০/৭/৩১)
পদার্থ – (য়ৎ) যে (অজঃ) অজন্মা, প্রগতিশীল মহাত্মা (প্রথমম্) সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মের প্রতি (উষসঃ পুরা) উষাকালের পূর্বে, সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং (সূর্য়াৎ পুরা) সূর্যাস্থের পূর্বে (সং বভূব) সংযুক্ত হয়ে গিয়ে উপাসনা করে এবং (নাম) নমস্কার করার যোগ্য পরমেশ্বরের (নাম্না) নাম ওঙ্কারের সহিত (জোহবীতি) জপ করে (সঃ হ) তিনিই (তৎ) সেই (স্বরাজ্যম্) স্বরাজকে, আত্মপ্রকাশকে, মুক্তিকে (ইয়ায়) প্রাপ্ত করে (য়স্মাৎ পরম্) যার থেকে বৃহৎ (অন্যৎ ভূতম্) অন্য কিছুই, অন্য কোনো পদার্থ (ন অস্তি) নেই।
সরলার্থ – যে অজন্মা, প্রগতিশীল মহাত্মা সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মের প্রতি উষাকালের অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্থের পূর্বে সংযুক্ত হয়ে গিয়ে উপাসনা করে এবং নমস্কার করার যোগ্য পরমেশ্বরের নাম ওঙ্কারের সহিত জপ করে, তিনিই সেই স্বরাজকে, আত্মপ্রকাশকে, মুক্তিকে প্রাপ্ত করে, যার থেকে বৃহৎ অন্য কিছুই, অন্য কোনো পদার্থ নেই।
এই ছয়টি কার্য ঘুরে ফিরে একই স্থানের সিদ্ধান্তকে জ্ঞাত করায়। আর তা হলো – ঈশ্বরকে জানা। এই ছয় কর্ম শুধু এতটুকুতেই সমাপ্ত থাকে না, বরং ঈশ্বরকে জেনে তাঁকে প্রাপ্ত করতে যা যা প্রয়োজন সকল কিছুর বর্ণনা এর মধ্যে রয়েছে।
একটি পর্বালোচনা করা যাক — মুক্তি বা মোক্ষ লাভের জন্য দরকার ঈশ্বর প্রাপ্তি। ঈশ্বর প্রাপ্তির মূল চাবিকাঠি হলো বেদ, তাই বেদের অভ্যাস করতে হবেই। এইজন্যই তো মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী আর্য সমাজের নিয়মাবলীর মধ্যে তৃতীয় নিয়মটি রেখেছেন “বেদ সকল সত্য বিদ্যার পুস্তক, বেদের পঠনপাঠন, শ্রবণ-শ্রাবণ সকল আর্যের পরম ধর্ম”। এখন বেদাভ্যাস করে বেদজ্ঞান লাভ হলো, কিন্তু এখন কাজ হলো সেই বেদজ্ঞানকে ধারণ করে সনাতনের অনন্য ভিত্তি বিবিধ তপস্যা বা ব্রতপালন করা। অতঃপর জ্ঞান চর্চা করা। জ্ঞানের চর্চা করে মনুষ্য পবিত্র হয় (গীতা ৪/৩৮) বটে, কিন্তু শরীরকে পবিত্র করার জন্য প্রয়োজন ইন্দ্রিয় সংযমতা। একে ব্রহ্মচর্যের অন্তর্গতও করা যায়। এর পর আসবে ধর্মীয় কার্য সম্পাদন করা, যেমন যজ্ঞ, দান, তপস্যা ইত্যাদি। পরিশেষে এতসব সব কিছু করেই সমাপ্ত হয় না, আরও উচিত নিয়মিত ধ্যান অর্থাৎ পরমাত্মার উপাসনা করা।
সর্বোপরি আমরা বলতে পারি যে, কেবল মাত্র এই রূপ পন্থা অবলম্বন করেই মনুষ্য মুক্তিকে লাভ করতে পারবে, অন্য কোনো উপায়ে নয়।
ইত্যোম্
শ্রী রজিৎ চন্দ্র বর্মন